বিশেষ প্রতিনিধি, Md Al Rajib।।
মোঃ খায়রুল আলম খানঃ ইরানের সাথে যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানে কে ঘেরাও করতে দেশটির চারপাশের বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, আজারবাইজান থেকে শুরু করে সোমালিল্যান্ড পর্যন্ত। কিন্তু ইসরায়েল এসব গোপন তথ্য এখন প্রকাশ ও প্রচারই বা করছে কেন?
গত ৫ জুন ২০২৬। সিএনএন (CNN) হঠাৎ করে একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এই রিপোর্টে জানা যায় যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার সময় ইসরায়েল শুধু নিজের ভূখণ্ড থেকে অপারেশন চালায়নি বরং আজারবাইজান, ইরাক এবং সোমালিল্যান্ডে গোপনে একটি সমন্বিত সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।
এই তথ্যটি কেবল সামরিক কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং কূটনৈতিক ও নৈতিক বিচারেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছিল যে, তাদের ভূমি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না, তবু এই নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, পরিচালিত হয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় অক্ষত থেকেছে।
সিএনএন (CNN) -এর প্রতিবেদনের কেন্দ্রে রয়েছে আজারবাইজান। দক্ষিণ আজারবাইজানের কয়েকটি এলাকায় ইসরায়েলি এলিট কমান্ডো, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অপারেটিভ এবং বিমানবাহিনীর বিশেষ উদ্ধার ইউনিটের সদস্যরা মোতায়েন ছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ ইরানের তাবরিজ শহর থেকে মাত্র ৯৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল ইরানের সেই তাবরিজ শহর, যেখানে যুদ্ধের সময় ইসরায়েল সরাসরি বিমান হামলা চালিয়েছিল।
প্রাথমিকভাবে এই বাহিনীকে "জরুরি উদ্ধার দল" হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছিল অর্থাৎ ইরানের ভেতরে কোনো ইসরায়েলি বিমান ভূপতিত হলে পাইলটকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু পরিস্থিতির সাথে সাথে তাদের দায়িত্ব বদলে যায়। তারা ইন্টেলিজেন্স তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করে, ড্রোন অপারেশন পরিচালনা করে এবং উত্তর ইরানের ভেতরের সামরিক গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।
এই ঘাঁটিগুলো থেকে পরিচালিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অপারেশনটি ছিল আইআরজিসির (IRGC) গোয়েন্দা পরিচালক রহমান মোঘদামের হত্যাকাণ্ড। তার মৃত্যুর পরদিনই আজারবাইজানের ছিটমহল নাখচিভানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোন আঘাত হানে টার্মিনাল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এটিকে ইরানের "কুৎসিত, কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী কাজ" বলে অভিহিত করে। তবে ইরান এই হামলার কথা অস্বীকার করে। এবং ইসরায়েলি ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন হিসাবে অবিহিত করে।
আজারবাইজান ছিল একটি অংশ মাত্র। পুরো চিত্রটি আরও বিস্তৃত।
যুদ্ধের সময় ইরাকেও ইসরায়েল দুটি গোপন ঘাঁটি পরিচালনা করেছে একটি নাজাফ মরুভূমিতে, অন্যটি সৌদি সীমান্তের কাছে। এগুলো মূলত লজিস্টিক সহায়তা ও সার্চ-অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
এছাড়াও আফ্রিকার শিং অঞ্চলে অবস্থিত সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েল একটি কৌশলগত স্টেজ পয়েন্ট স্থাপন করেছে, যা ইসরায়েল থেকে ইরান পর্যন্ত দীর্ঘ পরিসরের বিমান অভিযানে মাঝপথে জ্বালানি ও সহায়তা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এই মোতায়েন ইসরায়েলকে ইরানের উত্তর, দক্ষিণ এবং পশ্চিম তিনটি সীমানা বরাবর একযোগে অবস্থান করার সুযোগ দিয়েছিল। এটি ইসরায়েলের সামরিক পরিসর শত শত মাইল বাড়িয়ে ইরানের গভীরে নিয়ে গেছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যুদ্ধ থামার পর এই তথ্যগুলো কেন এখন একে একে বেরিয়ে আসছে।
এই তথ্যগুলো এলোমেলোভাবে আসছে না। আগে দ্যা ওয়াল ষ্ট্রিট জার্নাল (WSJ) ও দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস (NYT) ইরাকের ঘাঁটির কথা বলেছে, এখন সিএনএন (CNN) আজারবাইজানের কথা বলছে প্রতিটি বড় আমেরিকান মিডিয়া আলাদা আলাদা টুকরো প্রকাশ করছে। অথচ এই ধারাবাহিকতা পরিকল্পনাহীন নয়।
এটি ইসরায়েলের "ডিটারেন্স ন্যারেটিভ" ভবিষ্যতের শত্রুদের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো যে, তোমাকে ঘিরে ফেলার ক্ষমতা আমাদের ছিল এবং আছে।
যে টার্গেট নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল ইসরায়েল ও আমেরিকা, তারা সেটা পূরণ করতে পারেনি। ইরানের সরকার পতন ঘটাতে পারেনি। অথচ মোসাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কনভিন্স করেছিল যে, যদি যুদ্ধের শুরুতেই ইরানি লিডারদের ও সর্বোচ্চ নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে ফেলা যায়, তাহলে ৪-৫ দিনের মধ্যেই ইরানের সরকার পতন হয়ে যাবে। কোনো লম্বা যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়াতে হবে না। কিন্তু হয়েছে উল্টো, সরকার পতন তো দূরের কথা, ইরানের সাধারণ মানুষ আরও সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। আর এটা হচ্ছে মোসাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এখন তাদের ইমেজ উদ্ধার করা দরকার, তাই এসব তথ্য তারা লিক করছে।
ইসরায়েল নিজেদের অনেক শক্তিশালি মিলিটারি পাওয়ার হিসাবে প্রজেক্ট করে এসেছে এতদিন, কিন্তু এই যুদ্ধে সেটা অনেকটাই ভেঙে গেছে। এয়ার ডিফেন্স ফেল করেছে, ইসরায়েলি ও আমেরিকান বিমান ভূপাতিত হয়েছে, ইসরায়েলের ভিতরে অনেক ক্রিটিকাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ইরানি মিসাইল ও ড্রোন হিট করেছে। হিজবুল্লাহ এফপিভি (FPV) ড্রোন ব্যবহার করে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে। মাত্র ৪০ দিনের যুদ্ধের পর'ই আমেরিকা ইরানের সাথে সিজফায়ারে বাধ্য হয়ে আলোচনার টেবিলে এসেছে। তাই তাদের ইমেজ রক্ষার্থেই এসব তথ্য প্রচার করা দরকার আছে। যাতে ইসরায়েলি সমর্থক ও নাগরিকদের কাছে মেসেজ যায়, ইসরায়েল বিনা প্রশ্নে এখন বিশ্বের সুপার পাওয়ার।
এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন আসবে যে, এসব দেশ কি জানত না? বিশেষ করে আজারবাইজানের মতো দেশের গোয়েন্দারা কীভাবে ফেল করলো?
সিএনএন (CNN) নিজেই স্বীকার করেছে যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে "কেউ সরাসরি অনুমতি দিয়ে, কেউ সম্ভবত না জেনেই" এই ইসরায়েলি নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে পড়েছে।
আজারবাইজানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্বিমুখী। দেশটির সাথে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে তেল ব্যবসা, অস্ত্র কেনাবেচা, সাইবার সহযোগিতা। আজারবাইজান ইসরায়েলের মোট তেল আমদানির ৪০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে। অথচ ২০২৬-এর জানুয়ারিতে আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানি সমকক্ষের সামনে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তার দেশের ভূমি "কোনো রাষ্ট্র" ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না। প্রকাশ্য বক্তব্য আর বাস্তব কর্মকাণ্ডের এই ব্যবধান বলে দেয় যে, বাকু সম্ভবত ঘটনা জানত, কিন্তু "অস্বীকারযোগ্যতা" বজায় রাখার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করে গেছে।
এছাড়াও আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের যুদ্ধে ইরান সরকারিভাবে নিজেকে নিরপেক্ষ ও শান্তির পক্ষে দাবি করলেও, আজারবাইজান মনে করে গোপনে কূটনীতি ও সামরিক সরবরাহের মাধ্যমে ইরান মূলত আর্মেনিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। হতে পারে আজারবাইজান সেটার'ই প্রতিশোধ নিয়েছে।
সোমালিল্যান্ডের বিষয়টি একটি প্রকাশ্য কূটনৈতিক বিনিময়ের মতো দেখাচ্ছে। ইসরায়েল ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শুরু এবং সোমালিল্যান্ডের ঘাঁটি ব্যবহার সংযোগটি কাকতালীয় নয়। যেখানে ইসরায়েলকেই বিশ্বের অনেক দেশ স্বীকৃতি দেয়নি, তারাই সোমালিল্যান্ডের ভূমিকে অন্য আরেকটি দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।সবচেয়ে জটিল ও বিস্ফোরক অধ্যায়টি ইরাককে নিয়ে। ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে তারা জানত না। কিন্তু পরিস্থিতির আসল চিত্র অনেক বেশি অস্বস্তিকর। দুই ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে তার রাডার সিস্টেম বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল আপাতত মার্কিন বিমানের সুরক্ষার অজুহাতে। রাডার বন্ধ মানে ইরাক নিজেই নিজের আকাশসীমায় অন্ধ হয়ে বসে ছিল। এই অন্ধত্বের সুযোগ নিয়েই ইসরায়েল নিরাপদে কাজ করতে পেরেছে।
একটি তদন্তে উঠে এসেছে যে ইরাকের অন্তত একটি ঘাঁটির কথা যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫-এর জুন থেকেই জানত কিন্তু তারা ইরাকের সরকারকে জানায়নি। যদিও না জানানোই স্বাভাবিক। ২০০৮ সালের মার্কিন-ইরাক কৌশলগত চুক্তিতে স্পষ্ট নিষেধ আছে যে, ইরাকের ভূমি তৃতীয় কোনো দেশের আক্রমণে ব্যবহার করা যাবে না। সেই চুক্তি লঙ্ঘিত হয়েছে এবং এটিই এখন ইরাকের সংসদে কেন্দ্রীয় অভিযোগে পরিণত হয়েছে। এসব তথ্য ফাঁস হওয়ায় ইরাকে সংসদীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রিয়াদ খান/আয়না নিউজ