পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর অবশেষে পতন ঘটেছে তৃণমূল কংগ্রেস-এর। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে হটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে এসে সেই শক্তিশালী অবস্থান হারাল তার দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের ভারসাম্যহীনতা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতাই এই ভরাডুবির প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বে ক্ষয়
২০১১ সালের ২১ জুলাই শহিদ দিবসের মঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। তবে তার উত্থানের ফলে দলের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা অভিজ্ঞ নেতাদের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
প্রবীণদের অবমূল্যায়ন ও নতুন সংস্কৃতি
দল প্রতিষ্ঠার সময় মুকুল রায়, সুব্রত বক্সী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম এবং শুভেন্দু অধিকারী-দের মতো নেতারা ছিলেন দলের মূল শক্তি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থা Indian Political Action Committee-এর প্রভাব বৃদ্ধি এবং তথাকথিত ‘কর্পোরেট’ রাজনীতির কারণে প্রবীণ নেতারা গুরুত্ব হারান। এতে দলের ভেতরে বিভাজন আরও প্রকট হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের প্রস্থান
২০১৭ সালে মুকুল রায়ের দলত্যাগ এবং ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারীর ভারতীয় জনতা পার্টি-তে যোগদান তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। বিশেষ করে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে।
সংস্কার উদ্যোগে ব্যর্থতা
‘নতুন তৃণমূল’ গড়ার লক্ষ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘এক ব্যক্তি এক পদ’সহ বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। একইসঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে কিছু শীর্ষ নেতার পতন দলকে আরও বিপাকে ফেলে।
প্রকল্পের জনপ্রিয়তা, সংগঠনের দুর্বলতা
‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘যুবসাথী’র মতো জনমুখী প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেললেও দলের ভেতরের সংকট কাটাতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হওয়াই শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের এই পরাজয় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
হাফিজ/ আয়না নিউজ